পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান হচ্ছে

0
112

সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণে মূল কাঠামো (স্প্যান) আজ শনিবার উঠছে। এর মাধ্যমেই বহুল প্রত্যাশিত এই সেতু দৃশ্যমান হতে যাচ্ছে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, সেতুর জাজিরা প্রান্তে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটির ওপর এই ইস্পাতের কাঠামোটি বসানো হবে। ১৫০ মিটার
দৈর্ঘ্যের ও ৩ হাজার টনের বেশি ওজনের স্প্যানটি ৪ হাজার টন ক্ষমতার একটি ক্রেনে তোলা হয় গত রোববার। এরপর মাওয়া প্রান্ত থেকে ক্রেনটি চালিয়ে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাতে সময় লাগে দুই দিন। পরের কয়েক দিন প্রস্তুতি শেষে আজ সকালে স্প্যানটি খুঁটিতে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হবে। পুরো কাজটি হবে ক্রেন আর প্রযুক্তির সাহায্যে।

প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, স্প্যানটি তোলার জন্য রাত-দিন সবাই পরিশ্রম করছেন। এরপর সেতু দৃশ্যমান হবে। এখন পদ্মা সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে যাবে।

এই কাজ দেখার জন্য আজ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সেতু বিভাগের সচিব খোন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলামসহ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন উপস্থিত থাকবেন।

দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর কাজ দেখতে যেতে পারেন। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।

পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন সেতু বিভাগ। এই বিভাগ সূত্র জানায়, সেতুতে মোট খুঁটি (পিলার) হবে ৪২টি। এক খুঁটি থেকে আরেক খুঁটির দূরত্ব ১৫০ মিটার। এই দূরত্বের লম্বা ইস্পাতের কাঠামো বা স্প্যান জোড়া দিয়েই সেতু নির্মিত হবে। বর্তমানে ১৬টি খুঁটি নির্মাণের কাজ চলমান আছে। এগুলোতে পর্যায়ক্রমে স্প্যান বসানো হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে আরও অন্তত একটি স্প্যান বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে সেতু বিভাগের।

পদ্মা সেতুর প্রতিটি খুঁটির নিচে ছয়টি করে পাইল বসানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে পাইলের সংখ্যা ২৪০টি। ইস্পাতের এসব পাইল মাটির নিচে ৯৬ থেকে ১২৮ মিটার পর্যন্ত গভীরে বসানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৬৮টি পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আরও ১৭টি পাইল বসানোর কাজ চলমান আছে।

২০১৪ সালের ১৮ জুন মূল সেতু নির্মাণে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই করে সরকার। তাতে খরচ ধরা হয় ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। আর নদীশাসনের কাজ করছে চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। তাদের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। এই কাজের খরচ ধরা হয় ৮ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া দুই প্রান্তে টোল প্লাজা, সংযোগ সড়ক, অবকাঠামো নির্মাণ করছে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

পদ্মা সেতুর প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে প্রকল্পের কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে।

প্রকল্পের অগ্রগতিসংক্রান্ত সেতু বিভাগের প্রতিবেদন বলছে, গত আগস্ট পর্যন্ত পদ্মা সেতুর সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মূল সেতুর অগ্রগতি ৪৬ শতাংশ।

সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার পর একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে সেতু বিভাগ। সেই পরিকল্পনায় চার বছরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালের নভেম্বরের মধ্যে মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতলবিশিষ্ট পদ্মা সেতু হচ্ছে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরার মধ্যে। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য (পানির অংশের) ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। ডাঙার অংশ ধরলে সেতুটি প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। খুঁটির ওপর ইস্পাতের যে স্প্যান বসানো হবে, এর ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। আর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে এখন প্রায় চার হাজার লোক কাজ করছেন। তবে কর্মীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ে-কমে। শুকনো মৌসুমে বেশি লোক কাজ করেন। আবার বর্ষায় কিছুটা কমে যায়। কর্মরত মানুষের মধ্যে এক হাজারের বেশি বিদেশি, যাঁদের বেশির ভাগই চীনের। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপানসহ আরও অনেক দেশের নাগরিক আছেন। তাঁদের বেশির ভাগ পরামর্শক।

পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় শতাধিক ক্রেন মজুত আছে। এর মধ্যে বড় একটি ক্রেনের ভার বহনের ক্ষমতা ৪ হাজার টন। এটি দিয়েই প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন ওজনের ইস্পাতের কাঠামো তোলা ও খুঁটিতে বসানো হবে। আর ২ হাজার ৪০০ ও ১ হাজার ৯০০ কিলোজুল ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি হাইড্রোলিক হাতুড়ি দিয়ে পাইল বসানোর কাজ চলছে। এর বাইরে নদীশাসনে সক্রিয় আছে বেশ কিছু ড্রেজার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here